
পাইলস কি? কিভাবে হয়? কেনো হয়? বাচার উপায় কি?
কথায় আছে না, “ভোগে নয় ত্যাগেই সুখ”। সেই ত্যাগ যখন ঠিক ঠাক হয়না, সেই কষ্ট যার হয় সে ছাড়া আর কেও বুঝেনা। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, আমাদের বিশ্বে প্রায় ১৫ শতাংশ মানুষ মলদ্বারের সমস্যায় ভুগেন, যার মধ্যে পাইলস বা অর্শ অন্যতম।
পাইলস বা অর্শ কি?
পায়খানার রাস্তায় অনেক রক্তনালি থাকে, সেগুলি কোনো কারনে নিচের দিকে নেমে গেলে সেটাকে আমরা পাইলস বলছি। রুগীরা এসে বলে, পায়খানা রাস্তায় কি জানি একটা মাংসের মত বের হয়; অনেকে বলে পায়খানার পরে পানি খারচ করার সময়, বাইম মাছে ঠোটের মত কি জানি একটা হাতে লাগে। পাইলস নিয়ে আলোচনা করলে, এর সাথে আরো ২টি রোগ চলে আসে। একটি হলো এনাল ফিসার, অপরটি এনাল ফিস্টুলা বা ভগন্দর। এনাল ফিসার বা পায়খানা রাস্তায় ক্ষত সৃষ্টি হওয়া, এটি একদমই কমন একটি সমস্যা। টয়লেট করার পর ব্যাথা বা জ্বালাপোড়া অনুভূত হলে এবং মলের সাথে রক্তের দাগ লেগে থাকলে আমরা বলতে পারি এটি এনাল ফিসার। দ্বিতীয় সমস্যা হলো এনাল ফিস্টুলা, এটি খুব রেয়ার কেইস, পায়খানার রাস্তা ছাড়াও এর পাশে অন্য আরেকটি রাস্তা তৈরী হওয়াকে এনাল ফিস্টুলা বলি। এটি হলে সব সময় পায়খানার রাস্তায় দূর্গন্ধ ও ভেজা থাকে। রুগীরা কমপ্লেইন করে- পায়খানার রাস্তার পাশে সব সময় ঘাঁ-এর মত হয়।
কিভাবে হয়?
এই তিনটি রোগের প্রধান কারন হলো কোষ্ঠকাঠিন্য। কিভাবে! আমাদের পায়খানার রাস্তা অনেকটা ইলাস্টিকের মত, কিন্তু এই ইলাস্টিকের ত একটা লিমিট আছে! অর্থাৎ আমাদের মলের সাইজ যখন অনেক বড়, শক্ত এবং ড্রাই হয়, তখন টয়লেট করলে পায়খানার রাস্তা ফেটে যায়, কেটে যায় (রক্ত বের হয়), ছিড়ে যায়, বা আঘাত প্রাপ্ত হয়, এবং এর সাথে পায়খানার রাস্তার প্রমিনেন্ট রক্তনালীগুলোও আঘাত প্রাপ্ত হয়ে নিচের দিকে নেমে আসে (যেটা রুগীরা ভাবে মাংস)। তাহলে কেটে-ছিড়ে-ফেটে গেলে কি হয়? ধরেন আপনার পায়ের হাটুতে কেটে গেলো বা ছিড়ে গেলো, সেটা ত তাড়াতাড়ি ভালো হবেনা, কারন হাটু বার বার নড়াচড়া করায় কাটা যায়গায় আবার ফেটে যাবে। ঠিক তেমনি পায়খানা রাস্তায় কেটে গেলে সেটাকে ভালো হইতে ত সময় দিতে হবে, একে ত সেই সময় পায়ই না (কারন এটি প্রতিদিন ব্যবহার হয়)্র, তার উপর আরো বিপদের ব্যপার হলো কাটা যায়গায় ময়লা লাগলে কি হয়? ইনফেকশন রাইট? তাইলে আমাদের পায়খানা রাস্তা দিয়ে কি ভালো জিনিস বের হয়? অবশ্যই না! এই ভাবেই মূলত এনাল ফিসার, ফিস্টুলা এবং পাইলস হওয়া শুরু হয়। তবে, শুধু কোষ্ঠকাঠিন্যেই নয় অনেক ক্ষেত্রে যাদের কয়দিন পরপর ডায়ারিয়া হয় বা পুরাতন আমাশা আছে, অর্থাৎ যাদের দিনে অনেকবার মলদ্বার ব্যবহার হয়, তাদের ক্ষেত্রেও পাইলসের সমস্যা হতে পারে।
বুঝা গেলো যে, মলদ্বারের রোগ হওয়ার পিছনে প্রধানত দায়ী হলো কোষ্ঠকাঠিন্য বা কনস্টিপেশন। তাহলে সবার আগে কিসের চিকিৎসা করতে হবে? কোষ্ঠকাঠিন্যের, রাইট? আপনি পাইলসের জন্য অপারেশন করান, মেডিসিন খান কিন্তু আপনার মল শক্ত হওয়ার পিছনে কি কারন সেটি নিয়ে না ভাবেন তাহলে, কয়দিন পর আবার পাইলস হবে। আমার কাছে অনেক রুগী আসে যারা পাইলসের ২ বার অপারেশন করেছে, কিন্তু কারনগুলো বাদ না দেয়ায় আবার হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, মোটামুটি ৭০ শতাংশ রুগীর পাইলস হয় কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে। তাই কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে বেঁচে থাকলে পাইলস বা মলদ্বারের বিভিন্ন ধরনের রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।
কেনো হয়?
আপনি বসে বসে থাকেন (অর্থাৎ, শারীরিক প্ররিশ্রম কম করেন) আপনার ওজন বেড়ে যাবে, কোলেস্টেরল বেড়ে যাবে। আপনি ভাজাপোড়া বেশী খাবেন আপনার এসিডিটি হবে। বাসি বা পচা খাবার খেয়েছেন আপনার ডায়ারিয়া হবে। রাতে ঘুমিয়েছেন কম পরেরদিন আপনার মাথা ব্যাথা হবে। সব রোগের পিছনে কোন না কোন কারন রয়েছেই, আপনি যদি কারন গুলো ফাইন্ড আউট করে সেগুলা বাদ না দেন, আপনি যত মেডিসিনই গ্রহন করেন না কেনো, সুস্থ হবেন না। আপনি বসে বসেই থাকবেন হাটবেন না আপনার ওজন কমবে? কোলেস্টেরল কমবে?
ঠিক তেমনি পাইলস বা মলদ্বারের বিভিন্ন সমস্যার প্রধান কারন হলো কনস্টিপেশন বা কোষ্ঠকাঠিন্য, তাই পাইলস ভালো করতে হলে সবার আগে কনস্টিপেশন ভালো করতে হবে। এখন জানতে হবে, কনস্টিপেশন কেনো হয়! সেই কারন গুলো যদি বাদ দেয়া যায় তাহলেই সুস্থ্য হওয়া সম্ভব। তা না হলে, ঔষধ খাবেন ভালো থাকবেন, ঔষধ শেষ কয়দিন পর আবার পাইলস হবে। তবে বলে নেয়া ভালো, অনেকে লোহা খেয়ে হজম করে, কিন্তু কেও কেও দুধ খেয়ে দুধ হজম করতে পারেনা। কারন সবার শারীরিক সক্ষমতা সমান না, এই জন্য দেখবেন একই ধরনের খাবার খেয়ে কেও দিব্বি সুস্থ আছে আবার কেও হাসপালে ভর্তি হচ্ছে।
কোষ্ঠকাঠিন্যে বা পাইলস এর কারন সমূহঃ
1. বাহিরের খাবার, ভাজা-পোড়া, তৈলাক্ত ও শুকনো খাবার বেশী খাওয়া এবং পানি, ফলমুল ও শাক-সবজি কম খাওয়া। হোটেলের শাক-সবজিতেও তেলের জাহাজ ডুবিয়ে দেয়, সেই তেলে যে আর কি কি আগে ভেজেছে সেটা বলা মুশকিল। ভাজা-পোড়া, তৈলাক্ত ও শুকনো খাবার বিভিন্ন কারনে হজম হয় না, হজম ঠিক মত না হলে কোষ্ঠকাঠিন্য হয়। শাক-সবজি ও ফলমুলে প্রচুর গুড ব্যাক্টেরিয়া (মাইক্রোবায়োম) রয়েছে, যেগুলো হজমে কাজ করে, নিয়মিত শাক-সবজী না খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য হয়। আবার পানি কম পান করলেও কোষ্ঠকাঠিন্য হয়।
2. দীর্ঘ সময় বসে বা দাঁড়িয়ে থাকা। অফিসের কাজে বা ড্রাইভিং করতে দীর্ঘ সময় বসে থাকতে হয়। দীর্ঘ সময় বসে থাকলে খেয়াল করবেন আমাদের পিছনে যে বড় মাসলটি (গ্লুটিয়াস) রয়েছে, সেখানে কিছুটা অবশ অবশ লাগে, মানে ঝিঝি ধরে। এর মানে হচ্ছে, এই এলাকায় রক্ত চলাচল কমে যায়। আমাদের শরীরের কোন অংশে যখন রেগুলার রক্ত চলাচল বন্ধ থাকে, সেখানকার কোষ বা সেল গুলা পুষ্টি না পেয়ে মারা যেতে শুরু করে। টয়লেট করার সময় আমাদের হালকা চাপ দিতে হয়, আর এই চাপ দেয়ার কাজটি করে এই পিছনের মাসলগুলি। তাই এই মাসলগুলি সুস্থ না থাকলে মলদ্বারের বিভিন্ন রোগ হতে পারে।
3. শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম না করা। শারীরিক পরিশ্রম না করলে রক্ত চলাচল ও হজম ঠিক মত হয় না, আর রক্ত চলাচল ও হজম ঠিক ঠাক না হলে কোষ্ঠকাঠিন্য হয়।
4. ঘুম কম হওয়া, দুঃশ্চিন্তা বা টেনশন করা। ব্রেইন সাভাবিক না থাকলে হজমে ইফেক্ট ফেলে, কারন আমাদের হজম প্রক্রিয়ার সাথে ব্রেইনের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আর তাই, হজমে সমস্যা হলেই কোষ্ঠকাঠিন্য বা বদহজম হয়।
5. প্রস্রাব-পায়খানার বেগ আটকিয়ে রাখা। মানুষের যখন টয়লেট করার ইচ্ছা হয় সেটা একদমি নেচারাল চাহিদা, সেই নেচারাল চাহিদা যখন আটকিয়ে রাখবেন তখন অন্য সময় চাইলেও আর ঠিকমত টয়লেট হবেনা।
বাঁচার উপায় কি?
খুব সিম্পল, একটু আগে যে কারনগুলো আলোচনা করেছি, সবগুলো বাদ দিতে হবে। অর্থাৎ-
বাসায় তৈরী করা খাবার খাবেন, ভাজা-পোড়া, মাংস, তৈলাক্ত ও শুকনো খাবার এড়িয়ে চলুন। প্রচুর পানি, ফলমুল ও শাক-সবজি খান।
প্রতিদিন ব্যায়াম করবেন।
পরিমিত ঘুমাবেন, টেনশন করবেন না।
প্রস্রাব-পায়খানার বেগ আটকিয়ে রাখবেন না।
ত্রিফলা (হরিতকি, আমলকি ও বহেড়া পাউডারের মিশ্রণ) বা সোনাপাতা ভেজানো পানি পান করুন।
প্রতিদিন ঘুমানোর পূর্বে ১ চামচ ইসবগুল ভূসি ১ গ্লাস পানিতে মিশিয়ে সঙ্গে সঙ্গে পান করুন।
……………
ডা. মো. তাসনীম আলম তালহা
No comments yet.
Leave a Comment