ডায়াবেটিসে প্রকৃতিক সমাধান কি

ডায়াবেটিসে প্রকৃতিক সমাধান কি

ডায়াবেটিস কি? কেন ও কিভাবে হয়? এবং প্রকৃতিক সমাধান কি? এর বিস্তারিত তথ্য উপাত্ত নিয়ে আজকের বিশেষ  স্বাস্থ্য টিপস –

সাধারণত রক্তের মধ্যে চিনির পরিমাণ বেড়ে গেলে আমরা বলছি ডায়াবেটিস। একদম শুরু থেকে শুরু করা যাক, আমরা যে খাবার খাচ্ছি বিশেষ করে কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার বা শর্করা খাবার- ভাত, রুটি, আলু, চিনি -এগুলো খাওয়ার পরে পেটের ভিতরে যেয়ে বা পাকস্থলীতে যেয়ে চিনিতে রূপান্তরিত হয়। কিভাবে? ধরেন, আমরা যে খাবারগুলি খাই সেটি প্রথমে মুখে, তারপরে পাকস্থলীতে, এরপরে ইন্টেস্টাইনে; সেখান থেকে পুষ্টিগুণগুলো রক্তের মাধ্যমে সম্পূর্ণ দেহে ছড়িয়ে যায়। ঠিক তেমনিভাবে কার্বোহাইড্রেট বা শর্করাযুক্ত খাবার চিনিতে রূপান্তরিত হয়ে রক্তের মধ্যে চলে আসে। এই রক্ত থেকে আমাদের দেহের সেল বা কোষ চিনিগুলোকে নিয়ে নিয়ে শক্তি উৎপন্ন করে।

এতক্ষণ যা বললাম তা হচ্ছে বডির নরমাল প্রসেস, প্রশ্ন হলো- একজন স্বাভাবিক মানুষের রক্তে এই চিনির পরিমাণ বাড়ছে না, কিন্তু একজন ডায়াবেটিস পেশেন্টের রক্তে চিনির পরিমাণ কেন বাড়ছে? একটু আগে বলতেছিলাম রক্ত থেকে চিনিগুলো সেলের মধ্যে যায় তারপরেই শক্তি উৎপন্ন হয়, এখন চিনির তো হাত পা নাই যে হেঁটে হেঁটে যাবে, তাই না? আমাদের শরীরে এক ধরনের হরমোন রয়েছে, যার নাম ইনসুলিন। ইনসুলিনের কাজ হচ্ছে রক্ত থেকে চিনিগুলোকে নিয়ে সেলের মধ্যে ঢুকায়ে দেওয়া। কোন কারণে শরীরে যদি প্যানক্রিয়াস নামক অর্গান থেকে ইনসুলিনের নিঃসরণ কমে যায় বা ইনসুলিন ঠিকমত কাজ না করে অথবা সেল ইনসুলিন গ্রহন না করে, তখনই রক্ত থেকে চিনিগুলো আর সেলের মধ্যে যায় না। রক্ত থেকে চিনি যদি সেলের মধ্যে না যায় তাহলে রক্তের মধ্যে বেশি থাকবে। তখন রক্ত পরীক্ষা করে জানতে পারি যে রক্তের মধ্যে চিনি বেড়ে গেছে! অর্থাৎ ডায়াবেটিস হয়েছে।

কেন ও কিভাবে হয়?

পরের প্রশ্ন হলো- রক্তের মধ্যে চিনি বা সুগারের পরিমাণ কেন ও কিভাবে বাড়ে? অনেকগুলো কারণ আছে, আমি দুইটি কারণ নিয়ে আলোচনা করব। এক. ইনসুলিন হরমোনের পরিমাণ কমে যাওয়া, দুই. ইনসুলিন হরমোনের রেজিস্টেন্স হওয়া বা ইনসুলিন হরমোন ঠিকমত কাজ না করা। 

প্রথমত, ইনসুলিন হরমোন কেন কমে যায়? অনেকগুলো কারণ আছে, আমি একটি বিষয় ফোকাস করতে চাই, সেটি হচ্ছে- শারীরিক পরিশ্রম কম করা বা ওজন বেড়ে যাওয়া। একদম সহজ করে যদি বলি, সেল বা কোষগুলো রক্ত থেকে চিনি বা গ্লুকোজ নিয়ে শক্তি উৎপন্ন করে। সেল কম শক্তি খরচ করলে (অর্থাৎ- না হাটলে, কম শরীর চর্চা বা পরিশ্রম করলে) কোষের রক্ত থেকে চিনি নেয়া কমে যায়, সেহেতু ইনসুলিনের কাজ বা উৎপাদন কমে যায়, এবং শরীর এটাতে অভ্যস্থ হয়ে পড়ে। 

দ্বিতীয়ত, ইনসুলিন রেজিস্টেন্স! ইনসুলিন রেজিস্টেন্স অনেকগুলো কারণে হয়, বিশেষ করে যাদের ফ্যামিলিগতভাবে ডায়াবেটিস আছে তাদের ক্ষেত্রে বেশি হয়। রেজিস্টেন্স ছাড়াও ওজন বেড়ে গেলে, শরীর চর্চা না করলে বা শারীরিক পরিশ্রম না করলেও ইনসুলিন রেজিস্টেন্স হতে পারে।

চিকিৎসা :

চলুন এবার জেনে নেই, প্রকৃতিকভাবে ডায়াবেটিস থেকে মুক্তি পাবেন কিভাবে! বিশেষ করে টাইপ টু ডায়াবেটিস, অর্থাৎ যারা এখনো ইনসুলিনের উপর নির্ভরশীল হননি তারা কিভাবে ডায়াবেটিস থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি পেতে পারেন! সেই জন্যে আমরা থ্রি ডি (D) ফলো করতে বলি। থ্রি ডি মানে হচ্ছে, ডি-ডায়েট, ডি-ডিসিপ্লিন, ডি-ড্রাগস। 

প্রথমে আসুন ডায়েট; খুব সহজ করে বললে, মিষ্টি জাতীয় খাবার (যা খেলে জিহ্বায় মিষ্টি লাগে) খাবেন না, ভাত/রুটি/আলু বা শর্করা খাবার কম খাবেন (খাবার প্লেটের ৩০%), শাক-সবজী বা তরকারী বেশী খাবেন (খাবার প্লেটের ৭০%), এবং মিষ্টি না এমন ফলমূল খাবেন যেমন- আমড়া, বাতাবি লেবু, কালো জাম, কামরাঙ্গা, কাচা পেয়ারা, কাচা পেপে, ডালিম, জামরুল, আমলকি, টক বরই, নাশপাতি ইত্যাদি। রাতের খাবারে চেষ্ঠা করবেন শুধু শাক-সবজী রাখতে (খাবার প্লেটের ১০০%) এবং সন্ধার পর পরেই খাওয়ার। কার্বহাইড্রেট বা শর্করা কম কেনো খাবেন? একদম সহজ উত্তর হলো- মুখ দিয়ে যত কম ঢুকাবো, রক্তে তত কম যাবে।

এরপর আসে ডিসিপ্লিন; ডিসিপ্লিনে আমি একটি বিষয়কে ফোকাস করবো, সেটি হচ্ছে সকাল বিকাল ১ ঘন্টা হাঁটবেন বা দৌড়াবেন অর্থাৎ শরীর চর্চা বা ব্যয়াম করবেন। আপনি একটানাও হাঁটতে পারেন আবার সকালে বিকালে ভাগ করেও হাঁটতে পারেন। হাঁটার ক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে যে, আপনার শ্বাস-প্রশ্বাস বাড়ছে কিনা এবং আপনার গা ঘামছে কিনা! শ্বাস-প্রশ্বাস বাড়লোনা গা ঘামলোনা তাহলে আপনার সেই হাঁটা হয়নি। আপনি কেন হাঁটবেন? হাঁটলে আপনার সেল চিনিগুলা খরচ করে, অর্থাৎ যখন আপনার সেলগুলা চিনি খরচ করবে, তখন সেল আবার চিনি নিবে। যখন চিনি নিবে তখন ইনসুলিনের প্রয়োজন হবে। এভাবে রক্তে সুগারের পরিমান কমবে পাশাপাশি প্যানক্রিয়াস ইনসুলিনের উৎপাদনও বাড়াবে।

সবশেষ হচ্ছে ড্রাগস; ড্রাগস এর ব্যাপারে আমি ঢালাও ভাবে বলার পক্ষে না। আপনারা অবশ্যই অবশ্যই একজন ভালো ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে আপনার ডায়াবেটিসের মেডিসিন গ্রহণ করবেন। একজন আয়ুর্বেদ চিকিৎসক হিসেবে আমি বলতে পারি, আয়ুর্বেদিকে অনেক ভালো ভালো ন্যাচারাল মেডিসিন আছে, যেগুলি প্রকৃতির বিভিন্ন হার্বস দিয়ে তৈরী, পার্শ প্রতিক্রিয়া কম, আপনারা চাইলে সেগুলি গ্রহণ করতে পারেন। পাশাপাশি বাজারে কিছু ন্যাচারাল সাপ্লিমেন্ট পাওয়া যায়, যেমন- স্পিরুলিনা, মেথীচূর্ণ, মরিঙ্গা ইত্যাদি, এগুলোও চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে গ্রহন করতে পারেন। 

লেখক :

ডা. মো. তাসনীম আলম তালহা

বি.এ.এম.এস (ঢাবি)

সাবেক শিক্ষক, হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ

আয়ুর্বেদা চিকিৎসক, এনসিয়েন্ট ওয়েলনেস বাংলাদেশ

HolistiCare International

No comments yet.

Leave a Comment