আমার বাচ্চা খাইতেই চায় না !

আমার বাচ্চা খাইতেই চায় না !

“আমার বাচ্চা খাইতেই চায় না”!! এই ডায়লগ শিশু বিশেষজ্ঞগন বেশী শুনে থাকেন। মাঝে-মধ্যে আমাদের মত সাধারন ফিজিশিয়ানদেরও শুনতে হয়। কিন্তু, বাসে বসে এই প্রথম শুনলাম!! ঘটনাটি আমার সামনের সিটে, দুজন ভদ্রমহিলা, বয়স কতই-বা হবে! তিরিশ কি পয়ত্রিশ এর মধ্যে, তারা একই অফিসে কাজ করে বলে মনে হলো। তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলো, আমি আড়ি পেতে কথা শুনছি বিষয়টি এমন না, মেইনলি “আমার বাচ্চা খাইতেই চায় না” এইটা শুনার পর থেকেই তাদের আলাপচারিতা শুনার আগ্রহটা জন্মালো।

যাইহোক, উনারা দুজন যা বলছিলেন মোটামুটি এরকম-

একজনঃ আমার বাচ্চাটা না আপা একটুও খাইতে চায় না, জোর করে খাওয়াতে হয়, প্রতিদিন যে কি কষ্ট হয় এদের খাওয়াতে, কি বলবো!!

আরেকজনঃ আর আমারটার কথা কি বলবো আপা!! খাবার নিয়ে পিছে পিছে দৌড়াইতে হয়, রীতিমতো যুদ্ধ!! দিন দিন শুকায়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে!

আমি হোস্টেল থেকে বাড়ি ফিরলে, আমার মা-কে কখনো বলতে শুনিনাই, “তুই আগের থেকে একটুমোটা হয়েছিস”, সব সময় বলতে শুনি “তুই ত শুকায়ে গেছিস”!! মা-রা মনে হয় এমনি হয়। চেম্বারে শিশু পেশেন্ট আসলে, আমার বাচ্চা খাইতেই চায় না, ভাত-তরকারী ত দেখতেই চায় না, দিন দিন শুধু শুকায়ে যাচ্ছে, মুখের রুচি নাই এগুলা পেরেন্টসদের অতি কমন কমপ্লেইনস। কিছুকমন পরামর্শ সবাইকেই দেয়া হয়- বাচ্চাদের জোর করে খাওয়ানোর কিছু নেই, ক্ষুধা লাগলে নিজে থেকেই খাবে, বাহিরের খাবার-ভাজাপোড়া খাওয়াবেন না, নাস্তা কমিয়ে মূল খাবার খাওয়ানোর অভ্যাস করাবেন, ইত্যাদি।

এইতো গত সপ্তাহের কথা, বাড়িওয়ালার ছোটো ছেলেকে (বয়স ২ বছর) বাড়িওয়ালী চড় দিতে দিতে খওয়াচ্ছিলো, বাচ্চাটা কাদতে কাদতে চোখের পানি, নাকের পানি ও ভাত সব এক সাথে খাচ্ছিলো। তার একটুপরেই বাচ্চাটা মুখ ভরে বমি করে সব ফেলে দিলো। পুরো ঘটনাটি আমার চোখের সামনেই, আমাকে দেখেই বাড়িওয়ালী বলছিলো, ভাই! খাইতে না চাইলে কি করবো বলেন। যাইহোক সে ভিন্ন কথা, তবে আজকাল বাচ্চাদের জোর করে খাওয়ানো এবং বাচ্চা খেতে না চাওয়া ভালো আয়ের পরিবারে একেবারে কমন হয়ে গেছে। অপেক্ষাকৃত স্বল্প আয়ের পরিবারের বাচ্চাদের এই সমস্যা নাই বললেই চলে, এদের বাচ্চারা যা পায় তাই খায়। বাচ্চাদের নরমাল খাবার (যেমন: ভাত-তরকারি, শাক-সবজি, ফলমূল) ছাড়া অন্যান্য খাবার (যেমন: তৈলাক্ত, ভাজাপোড়া, আইসক্রিম, চকলেট ইত্যাদি) বেশী খাওয়ার অভ্যাসটা সাধারনত সন্তানদের বাবা-মার জন্যই হয়ে থাকে।

করনীয় কি?

আসুন কিছু বিজ্ঞান সম্মত অভ্যাস, টেকনিক, ও নিয়ম-কানুন জেনে নেই, যা মেনে চললে এই সমস্যা অনেকাংশই দূর করা সম্ভব। যেমন-

  • বাচ্চার প্রথম ছয় মাস শুধু মায়ের বুকের দুধ পান করাবেন ।
  • দুই বছর বয়স পর্যন্ত মায়ের বুকের দুধের পাশাপাশি কমপ্লিমেন্টারী ফিডিং (বাড়তি খাবার) করাতে হবে।
  • বাচ্চকে যিনি খাওয়াবেন তিনি যেনো ধীরে-ধীরে, ধর্য্য ও উৎসাহ সহকারে খাওয়ান সেই দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে, কোনো মতেই জোর পূর্বক খাওয়ানো যাবেনা।
  • একই খাবার প্রতিবার না দিয়ে খাবারে নতুনত্ব আনুন এবং বাচ্চার পছন্দকে প্রাধান্য দিন।
  • বাচ্চার দৈনিক কি পরিমান খাবার প্রয়োজন তা পুষ্টিবিদ/ডাক্তার বা এই বিষয়ে অভিজ্ঞ এমন কারো কাছে পরামর্শ নিয়ে কেবল সেই পরিমান খাবারই তাকে খাওয়ানো।
  • দৈনিক যে পরিমান খাবার তার প্রয়োজন তা একবারে বা দুবারে না দিয়ে তিন থেকে চার বার ভাগ করে খাওয়াবেন।
  • যদি কোনো ভিটামিন-মিনারেলের অভাব থাকে তাহলে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ভিটামিন-মিনারেল সাপ্লিমেন্ট দিতে হবে।
  • বাচ্চা যদি অসুস্থ থাকে তাহলে, বাচ্চাকে বেশী বেশী তরল জাতীয় খাবার দিন এবং বার বার মায়ের বুকের দুধ পান করান।
  • সর্বোপরি, বাচ্চাকে খাবারের প্রতি উৎসাহী করুন ও পরিবারের সবাইকে নিয়ে এক সাথে বসে খাবার খাওয়ার অভ্যাস তৈরী করুন কারন বাচ্চারা অনুকরনীয়।

ডা. মোঃ তাসনীম আলম তালহা

বিএএমএস (ডিইউ)

আয়ুর্বেদিক ফিজিসিয়ান,

সাবেক লেকচারার, হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ।

HolistiCare International

No comments yet.

Leave a Comment